ফটোগ্রাফি কোর্সে আমাদের দ্বিতীয় ব্যবহারিক ক্লাস অনুষ্ঠিত হয় কারওয়ান বাজারে। দিনটি ছিল শুক্রবার, আর আগেই জানানো হয়েছিল—খুব ভোরে পৌঁছাতে হবে। ক্লাসের আগের কয়েকদিন ধরে কোর্স সমন্বয়ক জনাব মেজবাহউদ্দিন সুমন আমাদের গ্রুপে কারওয়ান বাজারের ইতিহাস নিয়ে বেশ কিছু লেখা শেয়ার করেছিলেন। জানানো হলো, শুক্রবার সকাল সাতটায় সবাইকে রিপোর্ট করতে হবে।
ভোর পাঁচটার জন্য মোবাইলে এলার্ম সেট করলাম। সতর্কতার জন্য সাড়ে পাঁচটায় আরেকটা এলার্মও রাখা ছিল। প্রথম এলার্ম বাজার সাথেই উঠে পড়লাম। ওয়াশরুমের কাজ সেরে তৈরি হতে হতে ঘড়িতে তখন সাড়ে পাঁচটা।
পৌনে ছয়টার দিকে রাইড শেয়ার অ্যাপ থেকে গাড়ি কল করলাম। সাধারণত এই সময় গাড়ি পেতে ২০–২৫ মিনিট লেগে যায়, তাছাড়া কিছু ড্রাইভার অফার একসেপ্ট করে ঝুলিয়ে রেখে হঠাৎ ক্যানসেলও করে দেয়—যা বেশ বিরক্তিকর। তবে সেদিন সে রকম কিছুই হলো না। মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই গাড়ি এসে গেল। প্রায় ফাঁকা রাস্তা দিয়ে ড্রাইভার আমাকে দ্রুতই কারওয়ান বাজারে পৌঁছে দিলেন। ঘড়িতে তখন সকাল ছয়টা পনের মিনিট।
গাড়িতে আসতে আসতে অনেকদিন পর ভোরের ঢাকা দেখার সুযোগ হলো। দূর থেকে স্ট্রিট লাইটগুলোকে স্পট লাইটের মতো লাগছিল। চারপাশ কুয়াশার চাদরে মোড়া থাকায় পুরো দৃশ্যটাই যেন অপার্থিব। বাস, ট্রাক আর গাড়িগুলো কুয়াশা ভেদ করেই ছুটে চলছিল। মনে হচ্ছিল—নিজস্ব কোনো বাহন থাকলে এই ভোর বা রাত-বিরাতেও হয়তো দারুণ কিছু ছবি তোলা যেত।
কারওয়ান বাজার মেট্রোরেল স্টেশনে পৌঁছে প্রথমে মনে হলো আমিই সবার আগে এসেছি। পরে জানতে পারলাম, সাকিব আরও আগে এসেছে। সে চট্টগ্রাম থেকে আসে—ক্লাসের আগের রাতে ট্রেন বা বাসে ঢাকায় পৌঁছে সারাদিন এদিক-ওদিক ঘোরে, সন্ধ্যায় ক্লাস করে আবার রাতেই চট্টগ্রাম ফিরে যায়। তার এনার্জি সত্যিই প্রশংসনীয়।
ধীরে ধীরে সবাই এসে জড়ো হলো। প্রায় আটটার দিকে ব্রিফিং শুরু হয়। গ্রুপ ছবি তোলার পর আমাদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে দেওয়া হলো ছবি তোলার জন্য। প্রতি দলে ৮–৯ জন করে, সঙ্গে একজন মেন্টর। মোট আটটি দল গঠন করা হয়। জনাব মেজবাহউদ্দিন সুমন, জনাব মীর শামসুল হক বাবু ও জনাব কে এম জাহাঙ্গীর আলম ঘুরে ঘুরে সব দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন।
আমাদের দলে ছিলেন ৯ জন। মেন্টর হিসেবে ছিলেন অনুপ রায়। তিনি এই কোর্সের নবম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং বর্তমানে দীপ্ত টিভিতে এনিমেটর হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর স্ত্রীও আমাদের ১১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। অনুপ’দা অত্যন্ত সহায়ক একজন মেন্টর। যে যার সমস্যাই হোক, ধৈর্য নিয়ে সমাধান বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। বিশেষ করে যারা নতুন ক্যামেরা কিনেছেন বা নতুন ব্যবহার করছেন—তাদের হাতে ধরেই প্রায় সবকিছু দেখিয়ে দিচ্ছিলেন।
আমাদের ছবি তোলা শুরু হয় রেললাইন ধরে, মাথার ওপর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে রেখে। শুরুতে পোর্ট্রেট ও কর্মরত মানুষের ছবি তোলা হয়। এখানে মুটে, সবজি বিক্রেতাসহ নানা পেশার মানুষদের দেখা গেল। বেশিরভাগই ছবি তুলতে আগ্রহ দেখালেও দু-একজন বলছিলেন—“ছবি তুলে কী হবে, দশ টাকা দিলেও তো হতো।”
এক জায়গায় দুইজন মহিলা ছোট একটি বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বসেছিলেন। ছবি তোলার অনুমতি দিলে তারা নিজেদের কষ্টের কথাও বললেন—বিশেষ করে শীতে কষ্ট আরও বেড়ে যায়। বললেন, এই ছবি যদি তাদের জন্য কম্বল বা কিছু সহায়তার ব্যবস্থা করে দিতে পারত, তাহলে খুব উপকার হতো। আমি খুব বেশি কিছু না বলে শুধু জানালাম—আমরা ফটোগ্রাফি শিখছি, শেখার অংশ হিসেবেই ছবি তোলা হচ্ছে। মনে মনে ভাবছিলাম, পাকা চুলের একজন মানুষ আবার কী শিখছে—এই ভেবে হয়তো আমাকে তারা একটু অন্য চোখেই দেখছেন। ছবি তোলার পর ধন্যবাদ দিলে মহিলা তার নাতির জন্য কিছু দিতে বললেন। আমি তখন আর কিছু না ভেবে ছোট একটি নোট বাচ্চাটির হাতে গুঁজে দিলাম।
এখানেই আরেকটি অভিজ্ঞতা হলো। এক চৌকির ওপর বসে এক মহিলা কিছু বিক্রি করছিলেন। ছবি তোলার কথা বলতেই তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। পাশে পড়ে থাকা ইট দেখিয়ে হুমকি দিলেন—এখনই ক্যামেরা ভেঙে দেবেন। আমি শান্তভাবে বললাম, সে কারণেই তো আগে অনুমতি চেয়েছি। তখন তিনি বললেন, “দেখতাছেন না কী বেচতেছি?” তখন খেয়াল করলাম—ছোট ছোট কাগজের পোটলা, রাংতা আর কিছু সিগারেট। বুঝলাম, তিনি নেশাজাতীয় কিছু বিক্রি করছেন। চৌকির ওপর মোটা পলিথিন দিয়ে তাবুর মতো তৈরি করা, ভেতরে আরও লোকজন আছে বলেও মনে হলো।
এরপর আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই লোহাপট্টিতে। এখানে কামাররা ছোট ছোট ফার্নেসে লোহা গরম করে পিটিয়ে নানা রকম জিনিস তৈরি করছিলেন। দৃশ্যটা দারুণ হলেও আমার তোলা ছবিগুলো খুব একটা ভালো হয়নি। বেশিরভাগ ছবিই ফোকাস ঠিক না থাকায় ব্লার হয়ে গেছে।
লোহাপট্টি থেকে আমরা গেলাম সবজি বাজারে। এখানে প্রচুর ছবি তোলা হয়। এখানেও আমার সঙ্গে একটি ছোট ঘটনা ঘটে। এক সবজিওয়ালা সবজি বিক্রি করার সময় শাটারের ক্লিক শব্দে চটে গিয়ে মাথার টুপি খুলে সবজির ঝাঁকায় ছুড়ে মারলেন। বললেন, “আপনাগো জ্বালায় বেচাবিক্রি করতেই পারতাছি না।” আমি শান্ত গলায় জানালাম—আপনার কাজে যেন ব্যাঘাত না হয়, সে কারণেই তো কিছু বলিনি। তার জবাব ছিল, “আপনারা দোকানের সামনে ভিড় করলে কাস্টমার আইবো কেমনে?”
এরপর আমরা ফলপট্টি ও প্লাস্টিক পণ্যের বাজারে যাই। এখানেও বেশ কিছু ভালো মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করা হয়। ফেরার পথে আমি সহ চারজন আমাদের অগ্রবর্তী দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। হাঁটতে হাঁটতে আবার মেট্রোরেল স্টেশনের কাছেই চলে আসি, যেখানে তখনও আমাদের দলের কয়েকজন অপেক্ষা করছিলেন।
উপসংহার
যদিও ক্যামেরার সঙ্গে আমার পরিচয় নতুন নয়, তবুও কম্পোজিশনসহ কিছু জায়গায় যে দুর্বলতা আছে, তা কারওয়ান বাজারে এসে আরও স্পষ্টভাবে টের পেয়েছি। পোর্ট্রেট বা কর্মজীবী মানুষের ছবি তোলা সম্ভব হলেও, দ্রুত পরিবর্তনশীল ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে একটি পরিপূর্ণ সুন্দর ফ্রেম তৈরি করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। ফটো রিভিউ ক্লাস হলে হয়তো ভুল-ত্রুটিগুলো আরও পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারবো।
আপাতত সিদ্ধান্ত নিয়েছি—শনিবার সকালবেলায় মাঝে মাঝে কারওয়ান বাজারে যাবো। ছবি তুলে বিকেলে ক্লাসে আসবো। এক ক্লিকে কমপক্ষে পাঁচটি করে ছবি তুলবো, যেন মুহূর্ত মিস না হয়। ইলেকট্রনিক শাটার ব্যবহার করবো, যাতে শব্দ না হয়। পাশাপাশি কোমরের কাছ থেকে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ছবি তোলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
Facebook Comments